নেতৃত্বের তত্ত্ব হিসেবে আচরণগত তত্ত্ব ও ট্রেইট বা সংলক্ষন তত্ত্ব | Theory of Leadership in Educational Management

নেতৃত্ব হল উৎসাহের সঙ্গে লক্ষ্য পূরণের জন্য অন্যদেরকে প্রভাবিত করা বা অনুপ্রাণিত করার একটি সচল প্রচেষ্টা। উপযুক্ত নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের তত্ত্ব (Theory of Leadership in Management) বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।

নেতৃত্বের তত্ত্ব | Theory of Leadership

লিভিংটন বলেছেন – নেতৃত্ব হল সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় ইচ্ছা অন্যদের মধ্যে জাগিয়ে তোলার সমর্থ্য।

নেতৃত্বের বিভিন্ন মতবাদ থেকে নেতৃত্বের তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে। যেগুলি নেতৃত্বদানকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে বা সম্পাদনা করতে সহায়তা করে। যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানের এই সমস্ত তত্ত্বগুলি বিশেষভাবে ফলপ্রসু। তাই নেতৃত্বকে সার্বিকভাবে পরিচালিত করার জন্য নেতৃত্বের তত্ত্বগুলি হল নিম্নলিখিত।

  • নেতৃত্বের আচরণগত তত্ত্ব | Behavioural Theory of Leadership
  • নেতৃত্বের ট্রেইট বা সংলক্ষন বা বৈশিষ্ট্য তত্ত্ব | Trait Theory of Leadership in Management
  • নেতৃত্বের পরিস্থিতিগত তত্ত্ব | Situational Theory of Leadership in Management

নেতৃত্বের আচরণগত তত্ত্ব | Behavioural Theory of Leadership in Management

নেতৃত্বের একটি অন্যতম তত্ত্ব হল আচরণগত তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে কার্যকর নেতৃত্ব নির্ভর করে নেতা বা নেতৃত্ব দানকারীর ব্যক্তিগত আচরণের উপর। এখানে কে নেতা তা দেখা হয় না। নেতার আচরণ কিভাবে অন্যান্যদের প্রভাবিত করে বা অন্যান্যদের কিভাবে অনুপ্রাণিত করে তা নির্ভর করে এই তত্ত্বের ভিত্তি।

আচরণগত নেতৃত্ব (Behavioral Leadership) এমন নেতৃত্ব যেখানে নেতার আচরণ, কাজের ধরন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি-ই প্রধান বিষয়। এখানে নেতা কিভাবে আচরণ করেন তার উপর ভিত্তি করে নেতৃত্বের ধরন নির্ধারিত হয়।

তাই আচরণগত তত্ত্ব অনুসারে নেতা সহকর্মীদের কর্মপদ্ধ থেকে কিভাবে প্রভাবিত করে এবং তারা কিভাবে পরিতৃপ্ত বা সন্তুষ্টি হয় সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

আচরণগত নেতৃত্ব তত্ত্বের প্রবর্তক হলেন Kurt Lewin-কে। তিনি নেতৃত্বের বিভিন্ন আচরণভিত্তিক ধরন (যেমন—Autocratic, Democratic, Laissez-faire) নিয়ে গবেষণা করেন, যা আচরণগত নেতৃত্ব তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করে।

এছাড়া এই তত্ত্বের বিকাশে আরও অবদান রেখেছেন—

  • Rensis Likert
  • Ralph Stogdill
  • Ohio State University ও University of Michigan-এর গবেষকগণ।

নেতৃত্বের আচরণগত তত্ত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তত্ত্বগুলি হল, নিম্নলিখিত –

নেতৃত্বের সিস্টেম তত্ত্ব | System-Four Theory of Leadership

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিচে গান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিকার্ড নেতৃত্বের সিস্টেম তত্ত্বের উদ্ভাবক। তিনি এই নেতৃত্বকে চারটি সিস্টেম বা তন্ত্রে ভাগ করেন এবং প্রত্যেকটি তন্ত্রের সাতটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেন, সেগুলি হল –

i) অনুপ্রেরণা সৃষ্টি,

ii) জ্ঞাতকরণ প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য

iii) আন্তঃপ্রভাব প্রক্রিয়া

iv) সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া

v) উদ্দেশ্য স্থির করণ ও প্রতিষ্ঠা করেন

vi) নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া এবং

vii) কার্যসম্পাদনের বৈশিষ্ট্য

ব্যবস্থাপনা গ্রিড নেতৃত্ব তত্ত্ব | The Managerial Grid Leadership Theory

নেতৃত্বের আচরণগত তত্ত্বের এটি একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব। নেতৃত্বের এই তত্ত্বটির প্রবক্তা হলেন Robert R. Blake ও Moulton (1962-64)। নেতৃত্বের বিভিন্ন তত্ত্বের মধ্যে এই অত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয়। এই তত্ত্বের Grid গুলি গড়ে উঠেছে মূলত দুটি বিশেষ মাত্রার উপর ভিত্তি করে, যথা –

  • উৎপাদনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে (concern form production)
  • মানুষের দিকে দৃষ্টি দিয়ে (concern form man)

এখানে X ও Y দুটি অক্ষ সার 9/9 grid অঙ্কন করা হয়। এগুলির থেকে 81 রকমের নেতৃত্বের style গড়ে ওঠে। এখানে গবেষকরা 5 টি style এর কথা বিশেষ ভাবে বলেছেন, সেগুলি হল –

Impoverished Management (1:1) – এখানে প্রয়োজনীয় কাজ করিয়ে নেবার জন্য ম্যানেজার সবথেকে বেশী চেষ্টা করেন।

কান্ট্রি ক্লাব ম্যানেজমেন্ট (1:9) – এখানে উৎপাদন অপেক্ষা ব্যক্তিদের দিকে লক্ষ্য দেওয়া হয়।

কর্তৃপক্ষের আনুগত্য / কার্য ব্যবস্থাপনা (9:1) – এক্ষেত্রে ব‍্যক্তি অপেক্ষা উৎপাদনের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দল ব্যবস্থাপনা (9:9) – এখানে উৎপাদন ও ব্যক্তি উভয়কে নিয়ে নেতা বা ম্যানেজার ব্যস্ত থাকেন।

সাংগঠনিক মানব ব্যবস্থাপনা (5:5) – এক্ষেত্রে ব্যক্তি ও উৎপাদনের উপর মাঝারি গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

নেতৃত্বের ট্রেইট বা সংলক্ষন বা বৈশিষ্ট্য তত্ত্ব | Trait Theory of Leadership in Management

নেতৃত্বের বিভিন্ন মতবাদ থেকে নেতৃত্বের ট্রেইড বা সংলক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য তত্ত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই তত্ত্বে নেতার কী শুন থাকা প্রয়োজন তা আলোচনা করা হয়েছে।

Stogill (1974) গবেষনা পত্রের উপর ভিত্তি করে কতকগুলি সংলক্ষনের কথা বলেন। যথা –

  • Psychic Trait (Energy, Hight, skill)
  • Personality Trait (Adaptibility, self-confidence)
  • Task oriented Trait (Achivement, Iniciative)
  • Social Trait (Faith, Social status, Interpersonal skill)

আবার, Barnar -Bass বিভিন্ন গবেষনা পত্র অনুসন্ধান করে দেখান যে নিম্নলিখিত সংলক্ষনগুলি 15 টির বেশী গবেষণাপত্রে নেতৃত্বের সংলক্ষনের বিষয়ের সমান –

  • বুদ্ধিজীবী
  • বৃত্তি
  • নির্ভরতা।
  • কার্যকলাপ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ
  • সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা।

নেতৃত্বের এই তথ্য অনুযায়ী বলা হয় – “Leaders are born, not made”. অর্থাৎ নেতা হল জন্মগত, একে তৈরি করা যায় না।

তাই বলা যায়, নেতৃত্বের তত্ত্ব অনুযায়ী ট্রেইট ও আচরণগত তত্ত্ব উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেইট তত্ত্ব অনুসারে, একজন নেতার কী গুণ থাকা উচিত তা বিবেচনা করা হয়, আর আচরণগত তত্ত্ব অনুযায়ী ব্যক্তির আচরণ কিভাবে একজন কার্যকর নেতা হওয়ার পথকে সুগম করে। তাই আধুনিক শিক্ষাগত ব্যবস্থাপনায় এই দুই তত্ত্বকে সমন্বয় করে নেতৃত্ব বিকাশ করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

SLST Education, NET, WB SET, CTET, Primary TET ও অন্যান্য পরীক্ষার উপযোগী MCQ প্রশ্নোত্তর

নেতৃত্বের তত্ত্ব – আচরণগত তত্ত্ব ও ট্রেইট বা সংলক্ষন তত্ত্ব (Theory of Leadership in Educational Management) থেকে বিভিন্ন MCQ প্রশ্ন উত্তর এখানে আলোচনা করা হল –

Q. আচরণগত তত্ত্ব অনুযায়ী নেতৃত্ব কিসের উপর নির্ভর করে?

A. জন্মগত গুণ
B. পরিবেশ
C. নেতার আচরণ
D. ভাগ্য

Show Answer

✅ উত্তর ⟶ C. নেতার আচরণ

Q. “Leaders are born, not made” — এই ধারণাটি কোন তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত?

A. Behavioral Theory
B. Trait Theory
C. Situational Theory
D. Contingency Theory

Show Answer

✅ উত্তর ⟶ B. Trait Theory

Q. নিম্নের কোনটি ট্রেইট তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য?

A. নেতৃত্ব শেখা যায়
B. আচরণই মূল ভিত্তি
C. ব্যক্তিগত গুণাবলী গুরুত্বপূর্ণ
D. পরিস্থিতি নির্ভর

Show Answer

✅ উত্তর ⟶ C. ব্যক্তিগত গুণাবলী গুরুত্বপূর্ণ

Q. নিম্নের কোনটি আচরণগত নেতৃত্বের একটি ধরন?

A. Charismatic Leadership
B. Autocratic Leadership
C. Genetic Leadership
D. Trait Leadership

Show Answer

✅ উত্তর ⟶ B. Autocratic Leadership

তথ্যসূত্র | Reference

  • বন্দ্যোপাধ্যায়, পি. (2010). শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন. কলকাতা: রীতা বুক এজেন্সি।
  • মুখোপাধ্যায়, এস. (2014). শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা. কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স।
  • Bush, T. (2003). Theories of educational leadership and management (3rd ed.). Sage Publications.
  • Hoy, W. K., & Miskel, C. G. (2013). Educational administration: Theory, research, and practice (9th ed.). McGraw-Hill Education.
  • Lunenburg, F. C., & Ornstein, A. C. (2012). Educational administration: Concepts and practices (6th ed.). Wadsworth Cengage Learning.
  • Sergiovanni, T. J., Burlingame, M., Coombs, F., & Thurston, P. (2009). Educational governance and administration (6th ed.). Pearson Education.
  • Online Sources

প্রশ্ন – নেতৃত্বের আচরণগত তত্ত্ব কি?

উত্তর – নেতৃত্বে যে তত্ত্ব অনুযায়ী নেতা বা নেতৃত্ব দানকারীর আচরণ ধারার উপর নেতৃত্বদান নির্ভর করে, সেই তত্ত্বকে নেতৃত্বের আচরণগত তত্ত্ব বলে।

প্রশ্ন – আচরণগত নেতৃত্বের উদাহরণ?

উত্তর – আচরণগত নেতৃত্বে মূল বিষয় হলো নেতার আচরণ ও ব্যবহারের ধরন। পরিস্থিতি ও দলের প্রয়োজন অনুযায়ী নেতা বিভিন্ন আচরণ প্রদর্শন করেন, যা নেতৃত্বকে কার্যকর করে তোলে। আচরণগত নেতৃত্বের উদাহরণ হল – একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষক নতুন একটি নিয়ম চালু করার আগে সব শিক্ষককে নিয়ে মিটিং করেন এবং সবার মতামত শুনে সিদ্ধান্ত নেন।

প্রশ্ন – আচরণগত নেতৃত্ব তত্ত্বের প্রবর্তক কে?

উত্তর – আচরণগত নেতৃত্ব তত্ত্বের প্রবর্তক হিসেবে সাধারণভাবে ধরা হয় Kurt Lewin-কে। তিনি নেতৃত্বের বিভিন্ন আচরণভিত্তিক ধরন (যেমন—Autocratic, Democratic, Laissez-faire) নিয়ে গবেষণা করেন, যা আচরণগত নেতৃত্ব তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করে।

Latest Education Articles

Leave a Comment

✅ Copied with source!