নেতৃত্ব হল উপযুক্ত নির্দেশ দান করা। এই নির্দেশ দান বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। অর্থাৎ নেতৃত্বের নির্দেশ দানের উপর ভিত্তি করে নেতৃত্বের প্রকারভেদ (Types of Leadership) পরিলক্ষিত হয়।
নেতৃত্ব যোগাযোগের একটি অন্যতম মাধ্যম। এই নেতৃত্বের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অন্য একজন ব্যক্তিত্বকে বা অনেকজন ব্যক্তিকে উপযুক্ত নির্দেশ দান করে থাকেন। তাই আধুনিক শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা।
নেতৃত্বের প্রকারভেদ বা শ্রেণীবিভাগ | Types of Leadership
শিক্ষাক্ষেত্র সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন – রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে নেতৃত্বদান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপযুক্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে যে কোন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা যায়।
তাই G. R. Terry বলেছেন – “নেতৃত্ব হল ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তার করার কাজ, পারস্পরিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্বেচ্ছাকৃত কর্ম প্রচেষ্টা সৃষ্টি হয়।”
অন্যের আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার বা কর্তৃত্ব প্রয়োগের জন্য নেতা নিজে যে ধরনের আচরণ প্রদর্শন করে সেই আচরণ পদ্ধতিকে নেতৃত্বের স্টাইল বা টাইপস (Types of Leadership) বলা হয়ে থাকে। শিক্ষাগত ব্যবস্থাপনার দিক থেকে নেতৃত্বের যে সমস্ত প্রকার বা স্টাইল পরিলক্ষিত হয় সেগুলি হল নিম্নলিখিত –
গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব | Democratic Leadership
যে নেতৃত্ব দানে নেতা অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন, তাকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে। অর্থাৎ এই নেতৃত্ব দলের প্রক্রিয়ায় অনুসরণকারীদের বাক স্বাধীনতা বা মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে। ফলে নেতা ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এই নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে নেতা অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন এবং দলের সমস্ত সদস্যদের মতামতের উপর গুরুত্ব দেন। এতে সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। তাই নেতৃত্বের প্রকারভেদের মধ্যে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব।
Kurt Lewin বলেছেন — গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলের সদস্যদের অংশগ্রহণ জড়িত। (“Democratic leadership involves participation of group members in decision making.”)
গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, সেগুলি হল –
i) গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব দলকেন্দ্রিক প্রকৃতির,
ii) এটি দ্বিমুখী প্রকৃতির,
iii) গণতান্ত্রিক প্রকৃতির,
iv) ইতিবাচক প্রেষণাযুক্ত প্রক্রিয়া।
স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব | Autocratic Leadership
নেতৃত্বের প্রকারভেদ এর মধ্যে একটি অন্যতম হল স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিপরীতমুখী ধারণা হল স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব।
নেতৃত্বদান প্রক্রিয়ায় নেতা অংশগ্রহণকারীদের কোনো মতামত ছাড়াই বা অংশগ্রহণকারীদের সাথে কোন আলাপ-আলোচনা ছাড়াই নিজে একা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ও নিজের সিদ্ধান্ত অপরের উপরে চাপিয়ে দেন, তখন সেই নেতৃত্ব দানের প্রক্রিয়াকে স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে।
এখানে নেতা অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কখনোই অংশগ্রহণ করেন না। সমস্ত সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিয়ে থাকেন। তাই এই ধরনের নেতৃত্ব একটু কঠোর প্রকৃতির হয়ে থাকে। ফলে দলের সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।
Kurt Lewin বলেছেন — স্বৈরাচারী নেতৃত্ব এমন একটি ধরণ যেখানে নেতা দলের সদস্যদের খুব বেশি অংশগ্রহণ ছাড়াই একা সিদ্ধান্ত নেন। (“Autocratic leadership is a style in which the leader makes decisions alone without much participation from group members.”)
স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। সেগুলি হল –
i) একক সিদ্ধান্ত কেন্দ্রিক প্রক্রিয়া,
ii) অধীনস্থদের সীমিত স্বাধীনতা,
iii) কঠোর নিয়ন্ত্রণ,
iv) একমুখী ও নেতিবাচক প্রেষণা যুক্ত প্রক্রিয়া।
উদাসীন নেতৃত্ব | Laissez-faire Leadership
যে নেতৃত্বদান প্রক্রিয়ায় নেতা তার কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত থাকে না বা উদাসীন থাকে এবং তার দায়িত্ব ও কর্তব্য অধস্থন বা অংশগ্রহণকারীর উপর চাপিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন, তাকে উদাসীন নেতৃত্ব বলে।
এখানে নেতা তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না বা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ভয় পান। এই নেতৃত্বের অনুসরণকারীরা নিয়ম-কানুন মেনে চলেনা ও কোনরকম অনুপ্রেরণা পায় না। ফলে শিক্ষা সহ কোনো কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো অনেক সময় সম্ভব হয় না।
উদাসীন বা মুক্ত নেতৃত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, সেগুলি হল –
i) অধীনস্থদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
ii) নেতা সরাসরি হস্তক্ষেপ কম করেন।
iii) কর্মীরা নিজেরাই পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেয়।
আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব | Bureaucratic Leadership
নেতৃত্বের প্রকারভেদের একটি অন্যতম প্রকার হল আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব। এই ধরনের নেতৃত্ব সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নেতা ও অনুসরণকারীদের মধ্যে আচরণ ধারার একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
Max Weber বলেছেন — আমলাতন্ত্র হল কঠোর নিয়ম, শ্রেণিবিন্যাস এবং শ্রম বিভাজন দ্বারা চিহ্নিত প্রশাসন ব্যবস্থা। (“Bureaucracy is a system of administration characterized by strict rules, hierarchy, and division of labour.”)
এই নেতৃত্বে নেতা ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং অধীনস্থদেরও সেই নিয়ম মেনে কাজ করতে হয়।
শিক্ষা প্রশাসনের ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক ক্ষেত্র সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব জনপ্রিয়। এই নেতৃত্বে অনুসরণকারীদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত ও খারাপ কাজের জন্য তিরস্কার করা হয়ে থাকে। আবার প্রতিটি কাজ লিখিত সাংগঠনিক আইন কানুন প্রমাণের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।
আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হল –
i) নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও বিধি-নিষেধ,
ii) স্তর ভিত্তিক পদ্ধতি,
iii) দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন,
iv) নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাযুক্ত প্রক্রিয়া।
সর্বোপরি বলা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্বের বিভিন্ন ধরন (Types of Leadership) পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ কাজের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী নেতৃত্বের ধরন ও পরিবর্তিত হয়ে থাকে। তবে আধুনিক শিক্ষা ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বদান পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
SLST Education, NET, WB SET, CTET, Primary TET ও অন্যান্য পরীক্ষার উপযোগী MCQ প্রশ্নোত্তর
নেতৃত্বের প্রকারভেদ বা শ্রেণীবিভাগ | Types of Leadership Styles থেকে বিভিন্ন MCQ প্রশ্ন উত্তর এখানে আলোচনা করা হল –
Q. নেতৃত্বকে Autocratic, Democratic এবং Laissez-faire এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন কে?
A. John Dewey
B. Kurt Lewin
C. Max Weber
D. Jean Piaget
Show Answer
✅ উত্তর ⟶ B. Kurt Lewin
Q. কোন ধরনের নেতৃত্বে দলের সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়?
A. Autocratic Leadership
B. Democratic Leadership
C. Bureaucratic Leadership
D. Authoritarian Leadership
Show Answer
✅ উত্তর ⟶ B. Democratic Leadership বা গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব
Q. কোন ধরনের নেতৃত্বে নেতা সমস্ত সিদ্ধান্ত একাই গ্রহণ করেন?
A. Autocratic Leadership
B. Democratic Leadership
C. Bureaucratic Leadership
D. Authoritarian Leadership
Show Answer
✅ উত্তর ⟶ A. Autocratic Leadership বা স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব
Q. কোন ধরনের নেতৃত্বে অধীনস্থদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়?
A. Laissez-faire Leadership
B. Autocratic Leadership
C. Bureaucratic Leadership
D. Authoritative Leadership
Show Answer
✅ উত্তর ⟶ A. Laissez-faire Leadership বা উদাসীন নেতৃত্ব
গ্রন্থপঞ্জি | Bibliography
- বন্দ্যোপাধ্যায়, পি. (2010). শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন. কলকাতা: রীতা বুক এজেন্সি।
- মুখোপাধ্যায়, এস. (2014). শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা. কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স।
- Bush, T. (2003). Theories of educational leadership and management (3rd ed.). Sage Publications.
- Hoy, W. K., & Miskel, C. G. (2013). Educational administration: Theory, research, and practice (9th ed.). McGraw-Hill Education.
- Lunenburg, F. C., & Ornstein, A. C. (2012). Educational administration: Concepts and practices (6th ed.). Wadsworth Cengage Learning.
- Sergiovanni, T. J., Burlingame, M., Coombs, F., & Thurston, P. (2009). Educational governance and administration (6th ed.). Pearson Education.
- Online Sources
প্রশ্ন – নেতৃত্ব কত প্রকার ও কি কি?
উত্তর – সাধারণভাবে নেতৃত্ব তিন প্রকারের। সেগুলি হল – গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব, স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব এবং উদাসীন নেতৃত্ব।
প্রশ্ন – স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব কি?
উত্তর – স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব (Autocratic Leadership) হল এমন নেতৃত্ব পদ্ধতি যেখানে সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একমাত্র নেতার উপর ন্যস্ত থাকে। এখানে নেতা নিজেই সিদ্ধান্ত নেন এবং অধীনস্থদের মতামত বা অংশগ্রহণ সাধারণত খুব কম বা একেবারেই থাকে না। এই নেতৃত্বদানে নেতার কথাই শেষ কথা হিসাবে বিবেচিত হয় এবং তিনি নিজেই কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
প্রশ্ন – নেতৃত্বের চার প্রকার কি কি?
উত্তর – নেতৃত্বে চার প্রকার হল গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব, স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব, উদাসীন নেতৃত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব।
প্রশ্ন – নেতৃত্বের তিনটি ধরন কি কি?
উত্তর – নেতৃত্বে তিনটি ধরন হল – স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব এবং উদাসীন নেতৃত্ব।
প্রশ্ন – গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব কাকে বলে?
উত্তর – যে নেতৃত্বদান প্রক্রিয়া নেতা ও অনুসরণকারীদের মধ্যে আলাপ আলোচনার সুযোগ থাকে বা মতামত প্রদর্শনের সুযোগ থাকে তাকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বলে। এই নেতৃত্ব দানে নেতা অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন।
Latest Education Articles
- সংগঠন ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা | Difference between Organization and Management in Education
- শিক্ষাগত ব্যবস্থাপনার নীতিসমূহ | Principles of Educational Management
- শিক্ষাগত ব্যবস্থাপনা কাকে বলে, সংজ্ঞা ও প্রকৃতি | Concept and Definition of Educational Management
- শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার গুরুত্ব | 10 Importance of Managerial Process in Education
- শিক্ষা ব্যবস্থাপনার পরিধি | Scope of Educational Management
- ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার উপাদান | Elements of Management Process with Examples
নেতৃত্বের প্রকারভেদ বা শ্রেণীবিভাগ | Types of Leadership Styles সম্পূর্ণ পোস্ট পড়ার জন্য ধন্যবাদ।





