বিভিন্ন মানসিক ব্যাধিগুলির মধ্যে ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক ব্যাধি হলো সিজোফ্রেনিয়া। সিজোফ্রেনিয়ার ফলে ব্যক্তিত্ব একেবারে ভেঙ্গে যায়। এখানে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) কি, এর কারণ, প্রকাশিত লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায় গুলি মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হল।
সিজোফ্রেনিয়ার ধারণা | Schizophrenia Concept
ইংরেজি Schizophrenia শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে যুক্ত। যথা – Schizo যার অর্থ হল ভেঙ্গে যাওয়া এবং Phrenia যার অর্থ হল ব্যক্তিত্ব। অর্থাৎ সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল – ব্যক্তিত্ব ভেঙে যাওয়া বা ব্যক্তিত্বের মধ্যে অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হওয়া।
বিশিষ্ট মনোবিদ ব্লইলার (Bleure) সর্বপ্রথম ১৯০৮ সালে সিজোফ্রেনিয়া রোগের নামকরণ করেন। তিনি সিজোফ্রেনিয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চারটি A কথা বলেছেন, যথা –
- Association (অ্যাসোসিয়েশন): চিন্তার মধ্যে সংযোগ ও ধারাবাহিকতার ব্যাঘাত।
- Affectivity (অ্যাফেক্টিভিটি): আবেগের প্রকাশে অসংগতি বা আবেগের তীব্রতা হ্রাস।
- Ambivalence (অ্যাম্বিভ্যালেন্স): একই ব্যক্তি বা বিষয় সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী অনুভূতি বা মনোভাব একসঙ্গে থাকা।
- Autism (অটিজম): বাস্তবতা থেকে সরে গিয়ে নিজস্ব কল্পনা ও অন্তর্জগতে বেশি নিমগ্ন থাকা।
সিজোফ্রেনিয়ার কারন | Schizophrenia Causes
কোনো একটি সুনির্দিষ্ট কারণে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) হয় না। অর্থাৎ সিজোফ্রেনিয়ার কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে সিজোফ্রেনিয়ার বিভিন্ন কারণ বর্তমান। বিভিন্ন মনবিদগণের মতে – সিজোফ্রেনিয়ার বিভিন্ন কারণ পরিলক্ষিত হয় সেগুলি হল –
বংশগত বা জিনগত প্রভাব
পরিবারের মধ্যে কোনো ব্যক্তির সিজোফ্রেনিয়ার (Schizophrenia) ইতিহাস ও লক্ষণ থাকলে তাহলে ওই বংশের যেকোনো ব্যক্তির এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তবে পরিবারের কারও সিজোফ্রেনিয়া থাকলেই অন্য সদস্যের ১০০% হবে, তা গবেষণায় এখনো প্রমাণিত হয়নি। এক্ষেত্রে একাধিক জিনের সম্মিলিত প্রভাব এই রোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রক্রিয়া
গবেষণায় সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু গঠনগত ও কার্যগত পার্থক্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং স্নায়বিক সংকেতের প্রক্রিয়াও এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষকগণ মনে করেন।
পরিবেশগত প্রভাব
পরিবেশগত প্রভাব বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রতিকূল প্রভাব সিজোফ্রেনিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অর্থাৎ ব্যক্তির বিকাশের পথে পরিবেশ, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং কিছু প্রাথমিক জীবন-অভিজ্ঞতা রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
মানসিক চাপ ও প্রতিকূল অভিজ্ঞতা
তীব্র মানসিক চাপ বা আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা যেমন – পিতা-মাতার মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক, শৈশবকালীন দুর্ঘটনা, হতাশা প্রকৃতি ব্যক্তির উপসর্গ শুরু হওয়া বা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষকগণ ও মনোবিদগণ মনে করেন। তবে মানসিক চাপ মানে সিজোফ্রেনিয়ার একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
অতিরিক্ত মাদকদ্রব্যের ব্যবহার
অতিরিক্ত মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বিশেষত গাঁজা বা আফিম বা হিরোইনের অতিরিক্ত ব্যবহার সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু মাদকদ্রব্য অতিরিক্ত সেবন ব্যক্তির মধ্যে মানসিক বিভ্রম বা সাইকোসিসের মতো উপসর্গও সৃষ্টি করতে পারে। তাই মনে বিদগন বলেন – মাদকদ্রব্যের অতিরিক্ত ব্যবহার এড়ানো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
জৈবিক ও সামাজিক কারণের সম্মিলিত প্রভাব
গবেষণায় বিভিন্ন মনোবিদগণ দেখেছেন যে – সিজোফ্রেনিয়ার (Schizophrenia) ক্ষেত্রে জিনগত প্রবণতা, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং পরিবেশগত প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই।তাই এই রোগকে কেবলমাত্র বংশগত, বা মানসিক চাপজনিত অথবা কেবলমাত্র সামাজিক সমস্যার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি বিভিন্ন কারণের সম্মিলিত ফল।
সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ | Schizophrenia Symptoms
সিজোফ্রেনিয়ার (Schizophrenia) কোনো একটি নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। ব্যক্তিভেদে এই লক্ষণগুলি পরিবর্তিত হয়। তবে নিচের আলোচিত লক্ষণগুলি কেবলমাত্র উক্ত রোগের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির মধ্যে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ আছে কিনা তার নিশ্চিতকরণ করতে মনোবিদদের সাহায্য নেওয়া জরুরী। অর্থাৎ সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিচে লক্ষণ গুলি উল্লেখ করা হল –
মনোযোগ ও স্মৃতির সমস্যা (Cognitive Difficulties)
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কাজে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা, নতুন তথ্য মনে রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে অসুবিধার সম্মুখীন হন। অর্থাৎ সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা বা একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করাও ব্যক্তির পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র ও দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হতে পারে।
উদ্যোগ ও প্রেরণার অভাব (Lack of Motivation)
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে দৈনন্দিন কাজ শুরু করার প্রবণতা বা সম্পন্ন করার আগ্রহ ও উদ্যোগ কমে যেতে পারে। এর ফলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত পড়াশোনা করা কিংবা ঘরের কাজ করার ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। তাই মনোবিদদের পরামর্শ ও সাহায্য এবং দ্রুততার সাথে যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলি মোকাবিলা করা সম্ভব।
হ্যালুসিনেশন (Hallucination)
বাস্তব জগতের কোনো উদ্দীপক উপস্থিত না থাকলেও কোনো কিছু শোনা, দেখা বা অনুভব করাকে হ্যালুসিনেশন বলে। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় আশপাশে কেউ না থাকা সত্ত্বেও কণ্ঠস্বর শুনতে পান। এই অভিজ্ঞতা বা সমস্যা বা হ্যালোসিনেশন তাঁর চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
ডিলিউশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাস (Delusion)
বাস্তব প্রমাণের অভাব থাকা সত্ত্বেও কোনো ভুল বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে ধরে রাখাকে ডিলিউশন বলে। যেমন, কেউ মনে করতে পারেন যে অন্যরা তাঁকে ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করছে। যুক্তি বা প্রমাণ দিয়ে এই বিশ্বাস পরিবর্তন করা অনেক সময় কঠিন হয়। অর্থাৎ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে এই ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস জনিত লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়।
অসংলগ্ন চিন্তা ও কথাবার্তা (Disorganized Thinking and Speech)
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তির চিন্তার মধ্যে স্বাভাবিক সংযোগ ও ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। ফলে তাঁর কথাবার্তা অসংলগ্ন, বিষয়বিচ্যুত বা বোঝা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অসুবিধা হয়।
আবেগের প্রকাশ হ্রাস (Reduced Emotional Expression)
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তির মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের মাত্রা কমে যেতে পারে। আনন্দ, দুঃখ বা অন্য অনুভূতি প্রকাশে ব্যক্তি ব্যর্থ হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই। অর্থাৎ অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারে না।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social Withdrawal)
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে পরিবার, বন্ধু ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করার প্রবণতা হ্রাস পায়। অর্থাৎ সামাজিক কার্যকলাপ বা পূর্বে পছন্দের কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এর ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক জীবন ব্যাহত হতে পারে।
এগুলি ছাড়াও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির আরোও যে সমস্ত লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়, সেগুলি হল –
- খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কে অনিহা,
- ব্যক্তি জড় পদার্থে পরিণত হয়,
- একই জায়গায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে,
- স্নেহ ভালোবাসা, মায়া মমতা, রসবোধ প্রকাশের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
- অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করতে ব্যর্থ হয়,
- সব সময় চুপচাপ বসে থাকে এবং অন্য জগতে বসবাস করে এরকম মনে হয়।
সিজোফ্রেনিয়ার প্রতিকার | Schizophrenia Remedies
মনোবিদগণের মতে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)একটি জটিল ব্যাধি। একবার আক্রান্ত হলে নিরাময় করা কষ্টসাধ্য। তবেসিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা, পুনরায় উপসর্গ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি কমানো, দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যক্তিকে যতটা সম্ভব স্বাধীন ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করা সম্ভবপর হয়। নিম্নে কয়েকটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে মনোবিদগণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যিক।
ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী অ্যান্টিসাইকোটিক (Antipsychotic) ওষুধ দিতে পারেন। এই ওষুধগুলি হ্যালুসিনেশন, ডিলিউশন এবং অন্যান্য সাইকোটিক উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কোন ওষুধ উপযুক্ত হবে, তার মাত্রা কত হবে এবং কত দিন ব্যবহার করতে হবে, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করেন। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসককে জানানো উচিত। নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা একদম উচিত নয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে চিকিৎসক ছাড়া নিজে নিজে রোগের লক্ষণ চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসা করা অনুচিত।
মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা পদ্ধতি
বিশেষজ্ঞ মনোবিদদের পরামর্শ ও সহায়তা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে উপসর্গ মোকাবিলা করতে, মানসিক চাপ সামলাতে এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারে।
প্রয়োজন অনুযায়ী কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (Cognitive Behavioural Therapy বা CBT) এবং অন্যান্য উপযুক্ত মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা মনোবিদগণ দিয়ে থাকেন।
পারিবারিক শিক্ষা ও সহযোগিতা
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবারের মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির বা রোগীর অভিজ্ঞতাকে উপহাস না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারেন, চিকিৎসা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে পারেন এবং দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করতে পারেন।
তাই রোগীর অস্বাভাবিক বিশ্বাসের সঙ্গে তর্ক করে তাঁকে অপমান না করে শান্তভাবে কথা বলা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া পরিবারের আবশ্যিক কর্তব্য।
পুনর্বাসন ও জীবনদক্ষতার প্রশিক্ষণ
কিছু ব্যক্তির পড়াশোনা, কর্মসংস্থান, সামাজিক যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য পুনর্বাসনমূলক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি জীবনদক্ষতার প্রশিক্ষণ, সামাজিক দক্ষতার অনুশীলন এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান-সহায়তা তাঁদের স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে সাহায্য করতে পারে।
নিয়মিত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিয়মিত ঘুম, সুষম খাদ্য, শারীরিক কার্যকলাপ এবং দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা দরকার যাতে তার সামগ্রিক স্বাস্থ্যে ভালো থাকে। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য এড়িয়ে চলা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তন দিয়ে সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসার বিকল্প তৈরি করা যায় না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সঙ্গে এসব অভ্যাস সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
পুনরায় উপসর্গ দেখা দেওয়া প্রতিরোধ
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে উপসর্গের নিরাময় হলে বা কমে গেলে একেবারে চিকিৎসা থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা দরকার। এক্ষেত্রে পরিবার রোগীকে সবসময় পর্যবেক্ষণ করবেন। যেমন – ঘুমের ব্যাঘাত বা পরিবর্তন, সন্দেহপ্রবণতা বৃদ্ধি, কণ্ঠস্বর শোনা বা দৈনন্দিন কাজকর্মে দ্রুত অবনতি। এক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভারতের সেরা সিজোফ্রেনিয়া চিকিৎসাকেন্দ্র | Best Schizophrenia Treatment Centers in India
সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা, যার চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, উপযুক্ত ওষুধ, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। ভারতে বেশ কয়েকটি সরকারি ও মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এই রোগের চিকিৎসা প্রদান করে। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্রের নাম ও অবস্থান তুলে ধরা হলো।
| প্রতিষ্ঠানের নাম (বাংলা ও ইংরেজি) | অবস্থান |
|---|---|
| ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস (NIMHANS) | বেঙ্গালুরু, কর্ণাটক |
| সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রি (CIP) | রাঁচি, ঝাড়খণ্ড |
| লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (LGBRIMH) | তেজপুর, অসম |
| অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS) | নয়াদিল্লি |
| ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান বিহেভিয়ার অ্যান্ড অ্যালাইড সায়েন্সেস (IHBAS) | দিল্লি |
| ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রি—সেন্টার অব এক্সেলেন্স ইন মেন্টাল হেলথ (IOP-COE) | আলিপুর, কলকাতা |
| ক্যালকাটা পাভলভ হাসপাতাল (Calcutta Pavlov Hospital) | গোবরা রোড, কলকাতা |
| লুম্বিনী পার্ক মেন্টাল হাসপাতাল (Lumbini Park Mental Hospital) | তিলজলা, কলকাতা |
| অন্তরা সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার (Antara Psychiatric Hospital & Rehabilitation Centre) | দক্ষিণ গোবিন্দপুর, বারুইপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা |
| ইনস্টিটিউট ফর মেন্টাল কেয়ার (Institute for Mental Care) | পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই তালিকাটি উল্লেখযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিচিতিমূলক তালিকা। চিকিৎসা নিতে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিষেবা বা সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা হয় কিনা, বহির্বিভাগের সময়সূচি ও অ্যাপয়েন্টমেন্টের নিয়ম প্রভৃতি যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
উপসংহার | Conclusion
সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা, যা ব্যক্তির চিন্তা, উপলব্ধি, আবেগ ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। এর কারণ একক নয়; জিনগত প্রবণতা, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং পরিবারের সহানুভূতিশীল সহযোগিতা রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
সর্বোপরি, সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কে কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরও সম্মান, নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
গ্রন্থপঞ্জি | Bibliography
- Weiten, W., Dunn, D. S., & Hammer, E. Y. (2012). Psychology applied to modern life: Adjustment in the 21st century (10th ed.). Wadsworth, Cengage Learning.
- Moritsugu, J., Vera, E. M., Jacobs, J. H., & Kennedy, M. (2016). Psychology of adjustment: The search for meaningful balance. SAGE Publications.
- Bhushan, B., & Bajpai, A. (2018). Psychology of adjustment. Om Publications.
- Schizophrenia – Concepts, Causes, Symptoms, and Remedies
- Online Sources
- PDF Study Materials
প্রশ্ন – সিজোফ্রেনিয়া হলে কি হয়?
উত্তর – সিজোফ্রেনিয়া হলে ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক অসুখ দেখা দেয়, যেমন – খাওয়া দাওয়া সম্পর্কে অনিহা, চুপচাপ বসে থাকা, স্নেহ ভালবাসা, মায়া মমতা প্রকাশের অভাব প্রভৃতি।
প্রশ্ন – সিজোফ্রেনিয়া রোগের ঔষধ কী?
উত্তর – সিজোফ্রেনিয়া রোগের ঔষধ বলতে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ রোগ অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদগণ চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ণয় করে থাকেন।
প্রশ্ন – সিজোফ্রেনিয়া রোগীরা কতদিন বাঁচে?
উত্তর – গবেষণায় দেখা গেছে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা সাধারণ মানুষের চেয়ে তুলনামূলক কম দিন বাঁচে। তবে এটা নির্ভর করে সম্পূর্ণ রোগের গভীরতা বা রোগীর কন্ডিশনের উপর। কারণ অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ উপশম করা সম্ভব হয় তবে সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা যায় না।
প্রশ্ন – Schizophrenia এর বাংলা অর্থ কি?
উত্তর – Schizophrenia বাংলা অর্থ হল সিজোফ্রেনিয়া বা ব্যক্তিত্ব ভেঙে যাওয়া বা ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপসংগতিমূলক লক্ষণ প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন – সিজোফ্রেনিয়া কি বংশগত?
উত্তর – বিভিন্ন মনোবিদগণের মতে সিজোফ্রেনিয়া হল বংশগত। তবে অনেক সময় বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে এটি হয়ে থাকে। যেমন – পিতা-মাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত, শৈশবকালীন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ প্রভৃতি।
Latest Education Articles
- KIEI – কুন্ডু ইন্ট্রোভার্সন এন্ড এক্সটোভার্সন ইনভেন্টরি | Kundu Introversion and Extroversion Inventory
- KNPI – কুন্ডু নিউরোটিক পার্সোনালিটি ইনভেন্টরি প্র্যাকটিক্যাল | Kundu Neurotic Personality Inventory
- অপসংগতিমূলক শিক্ষার্থীদের লক্ষণ বা চিহ্নিতকরণের উপায় | 7 Symptoms of Maladjustment Behaviour
- অপসংগতির কারণ গুলি আলোচনা | 10 Causes of Maladjustment
- উত্তম সংগতিবিধানের শর্ত বা লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য | Criteria of Good Adjustment
- কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ ও প্রতিকার | Causes and Prevention Maladjustment in Adolescence
সিজোফ্রেনিয়া – ধারণা, কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার | Schizophrenia – Concepts, Causes, Symptoms, and Remedies সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।





