কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ ও প্রতিকার | Causes and Prevention Maladjustment in Adolescence

কৈশোরকাল হল মানব জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ ও প্রতিকার (Maladjustment in Adolescence) বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

কৈশোরকাল হলো মানব জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন সময়। বিভিন্ন মনোবিদগণের মতে – কৈশোরকালের বয়স সীমা হল ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত। এই স্তরে শিশুর দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক প্রভৃতি দিকের বিকাশ সাধন হয়ে থাকে। এই স্তরে শিশুর মধ্যে বিভিন্ন অন্তদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যার ফলে অনেক সময় তাদের মধ্যে হীনমন্যতা, হতাশা প্রভৃতি সৃষ্টি হয় ও শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপসংগতিমূলক আচরণ দেখা দিতে পারে।

কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ ও প্রতিকার | Causes and Prevention Maladjustment in Adolescence

কৈশোর কাল বা বয়ঃসন্ধিকাল হলো মানব জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন হয়ে থাকে। কিন্তু কৈশোরকালে শিশুরা বিভিন্ন সামাজিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যায়। তাই বিশিষ্ট মনোবিদ স্ট্যানলি হল – কৈশোরকালকে ঝড়ঝঞ্ঝার কাল হিসেবে চিহ্নিতকরণ করেছেন।

কৈশোরকালে বিভিন্ন ধরনের অপসংগতিমূলক আচরণ দেখা দেয়। যেমন – চুরি করা, মিথ্যা কথা বলা, অতিরিক্ত সাহসিকতা প্রদর্শন, সহপাঠী নির্যাতন, যৌন নির্যাতন প্রভৃতি। তাই কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ যে সমস্ত দিক থেকে পরিলক্ষিত হয় সেগুলি প্রতিকারসহ আলোচনা করা হল।

কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ | Causes Maladjustment in Adolescence

অপসংগতি হল ব্যক্তিত্ব বিশৃঙ্খলাগত আচরণ। যেমন – হতাশা, মানসিক চাপ, হীনমন্যতা প্রভৃতি। এগুলি কৈশোরকালে অপসংগতির লক্ষণ। কৈশোরকালে অপসংগতির কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই। কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ বিভিন্ন দিক থেকে হয়ে থাকে। সেগুলি হল –

পারিবারিক সমস্যা

পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে কৈশোরকালে অপসংগতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন – অতিরিক্ত শাসন বা শিশুদের মানসিক নির্যাতন, বাবা-মায়ের মধ্যে খারাপ সম্পর্ক, দারিদ্রতা প্রভৃতি।

সহপাঠী ও সামাজিক চাপ

কৈশোরকালে সামাজিক বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমবয়সী বন্ধুদের প্রভাব বৃদ্ধি। দিনের একটি বড় সময় তারা সহপাঠীদের সঙ্গে কাটাতে চাই। কিন্তু সহপাঠী ও সামাজিক বিভিন্ন চাপে তাদের মধ্যে অপসংগতিমূলক আচরণ দেখা দেয়। এর ফলে অনেক সময় সহপাঠী নির্যাতনের মতো ঘটনা আমাদের সামনে আসে।

মানসিক সমস্যা

কৈশোরকালে মানসিক চাহিদা বেশি থাকে। তাই মানসিক চাহিদা পরিপূরণের অভাব বোধ করলে শিশুর মধ্যে অপসংগতি দেখা দেয়। অর্থাৎ এই বয়সে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল শারীরিক পরিবর্তনের সাথে সাথে মানসিক যে পরিবর্তন ঘটে তার ফলে বিভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা তার মনের কোনায় উঁকি মারে ।। তাই কৈশোরকালে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা যেমন – হতাশা, মানসিক চাপ প্রভৃতি থেকে অপসংগতির জন্ম নেয়।

শারীরিক পরিবর্তন

প্রতিটির বয়স স্তরে শিশুর মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কৈশোরকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন ভিন্ন ধর্মী হয়ে থাকে। ফলে তারা একে অপরের মধ্যে শারীরিক টান অনুভব করে।

শারীরিক পরিবর্তনের ফলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সম্পর্ক স্থাপনে তারা আগ্রহী হয়। এক্ষেত্রে যদি কোন বাধা আসে (যেমন – সামাজিক বাধা) তখন শিশুর মধ্যে অপসংগতি দেখা দেয়। তাছাড়া শারীরিক গঠনগত পরিবর্তনের ফলে তারা মানসিকভাবে অনেক সময় ভেঙে পড়ে। যা তাদের অপসংগতিমূলক আচরণ (যেমন – যৌন নির্যাতন বা সহপাঠী নির্যাতন) করতে বাধ্য করে।

মিডিয়া ও প্রযুক্তির অপব্যবহার

বর্তমানে মিডিয়া ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে কৈশোরকালে শিশুদের মধ্যে অপসংগতি দেখা দেয়। যেমন – সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ, যৌনতা, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি প্রভৃতি কৈশোরকালে শিশু মনকে বিকশিত হতে বাধা দেয়। ফলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপসংতিমূলক আচরণ করতে উৎসাহী করে।

বিশেষ করে ইউটিউব ও ফেসবুকে ছোট ছোট ভিডিও শিক্ষার্থীদের মনকে বিষময় করে তুলছে, ফলে তাদের মধ্যে বিকৃত রুচির জন্ম হচ্ছে। কৈশোরকালে অপসংগতির কারণ মধ্যে অন্যতম হলো মিডিয়া ও প্রযুক্তির অপব্যবহার।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

কৈশোরকালে অপসংগতির কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই বয়সে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ফলে অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন কাজে চলে যায়। পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে অপসংগতি দেখা দেয়।

কৈশোরকালে অপসংগতির প্রতিকার | Prevention Maladjustment in Adolescence

কৈশোরকাল প্রতিটি মানব শিশুর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। এই সময়ে বিভিন্ন কারণে শিশুর মধ্যে যে সমস্ত অপসংগতি দেখা দেয়, সেগুলি সহজে প্রতিকার করা যায়। অর্থাৎ অপসংগতির কারণগুলি প্রতিকার করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। তাই কৈশোরকালে অপসংগতির প্রতিকার (Prevention Maladjustment in Adolescence) যেভাবে করা সম্ভব, সেগুলি নিম্নলিখিত –

সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ

বর্তমানে পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অশান্তি, বা পরিবার ভেঙে যাওয়া, বাবা-মার মধ্যে সম্পর্কের অভাব প্রভৃতির জন্য অপসংগতি দেখা দেয়। তাই শিশুর মধ্যে অপসংগতি আচরণ কমাতে হলে সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ আবশ্যিক। তাই পিতা-মাতার উচিত শিশুর সামনে কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা না করা এবং পিতা-মাতা শিশু সন্তান সকলের সঙ্গে একটা সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা।

মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং

কৈশোরকালে শিশুর মধ্যে অপসংহতি দেখা দিলে তাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট বা সহায়তা দান করতে হবে। প্রয়োজন হলে কাউন্সিলর এর কাছে নিয়ে গিয়ে তাকে কাউন্সিলিং করার মধ্য দিয়ে অপসংহতি দূর করা সম্ভব।

সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ

কৈশোরকালে শিশুর মানসিক, শারীরিক চাহিদা প্রবল থাকে। তাই পরিবার, বিদ্যালয় আত্মীয়-স্বজন সবাইয়ের উচিত শিশুকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপসংগতি দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব তাদেরকে সঠিক দিক নির্দেশনা ও পরামর্শদান করা উচিত।

সময় ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা

কৈশোরকালে শিশুদের সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তাভাবনা গঠন করা জরুরী। এতে শিশুর মধ্যে নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা দূর হয়। অর্থাৎ মনীষীদের জীবনী পাঠ তাদের কার্যধারা প্রভৃতি পাঠ করার মধ্য দিয়ে শিশুর মধ্যে ইতিবাচক চিন্তা ও সঠিক সময়ের সঠিক কাজ করার প্রবণতা তৈরি করতে পারলেই কৈশোরকালে শিশুদের মধ্যে সহজে অপসংগতিমূলক আচরণ দেখা দেয় না।

বন্ধু ও সামাজিক সমর্থন

কৈশোরকালে শিশুদের মধ্যে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ ও সামাজিক সমর্থন প্রত্যাশা থাকে। এই সময়ে শিশুরা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে। অর্থাৎ শিশু যদি সঠিক বন্ধু বা বান্ধবী না পায় পাশাপাশি সামাজিক সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়। তাহলে তার মধ্যে অপসংগতিমূলক বিভিন্ন আচরণ দেখা দিতে পারে। তাই বন্ধু ও সামাজিক সমর্থন অপসংগতির প্রতিকারের অন্যতম উপায়।

আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি

কৈশোরকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার অভাব অপসংগতি তৈরি করে। তাই এই বয়সের শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বাড়ানো ও আত্মনির্ভরতার প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ তারা যাতে আত্মনির্ভর ও আত্মবিশ্বাসী হতে পারে তার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলী বা হাতের কাজ বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার।

উপসংহার | Conclusion

পরিশেষে বলা বলা যায় যে, প্রতিটি ব্যক্তি আলাদা বৈশিষ্ট্যধর্মী। কৈশোরকালে সমস্ত শিশুর মধ্যে একই ধরনের অপসংগতিমূলক আচরণ বা একই কারণে অপসংগতি দেখা দেয় না। আবার কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে অপসংগতি তৈরি হয় না। বিভিন্ন কারণে অপসঙ্গতি দেখা দিতে পারে। তাই অপসংগতি সঠিক কারণ অনুসন্ধান করতে পারলেই সহজেই অপসংহতি প্রতিকার করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পরিবার, পিতা-মাতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব প্রকৃতির সহযোগিতার মাধ্যমে কৈশোরকালে সহজেই অপসংগতিগুলো দূর করে সুস্থ সহজ সরল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

গ্রন্থপঞ্জি | Bibliography

  • Weiten, W., Dunn, D. S., & Hammer, E. Y. (2012). Psychology applied to modern life: Adjustment in the 21st century (10th ed.). Wadsworth, Cengage Learning.
  • Moritsugu, J., Vera, E. M., Jacobs, J. H., & Kennedy, M. (2016). Psychology of adjustment: The search for meaningful balance. SAGE Publications.
  • Bhushan, B., & Bajpai, A. (2018). Psychology of adjustment. Om Publications.
  • Online Sources
  • PDF Study Materials

প্রশ্ন – কৈশোর কাল বলতে কী বোঝ?

উত্তর – কৈশোরকাল মানব জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাল। যে বয়সে শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরিবর্তন হয়, বিশেষভাবে যৌন পরিবর্তন সূচিত হয় (পুরুষের শরীরে শুক্রাণু উৎপাদিত হয় ও নারীরা ঋতুমতি রজঃস্বলা হয়) সেই বয়সে কৈশোরকাল বলে। কৈশোরকালের বয়সসীমা হল 12 থেকে 18 বছর পর্যন্ত।

প্রশ্ন – কিশোর কালের বয়স সীমা কত?

উত্তর – বিভিন্ন মনোবিদগণের মত অনুযায়ী – কৈশোরকাল বা কিশোর কালের বয়সসীমা হল 12 থেকে 18 বছর পর্যন্ত।

Latest Education Articles

Leave a Comment

✅ Copied with source!